দীর্ঘ দিন সীমাহীন কষ্ট ও অবর্ণনীয় যাতনা সহ্য করে মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন। মায়ের পেটে সন্তান যতই বৃদ্ধি পেতে থাকে তার কষ্টের মাত্রা ততই বাড়তে থাকে। মৃত্যু যন্ত্রনা পার হয়ে যখন সন্তান ভূমিষ্ট হয় তখন এ নবজাতককে ঘিরে মায়ের সব প্রত্যশা এবং স্বপ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। এই নবজাতকের ভিতর সে দেখতে পায় জীবনের সব রূপ এবং সৌন্দর্য। যার ফলে দুনিয়ার প্রতি তার আগ্রহ এবং সম্পর্ক আরো গভীরতর হয়। পরম আদর-যত্নে সে শিশুর প্রতিপালনে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। নিজের শরীরের নির্যাস দিয়ে তার খাবারের ব্যাবস্থা করে। নিজে কষ্ট করে তাকে সুখ দেয়। নিজে ক্ষুর্ধাত থেকে তাকে খাওয়ায়। নিজে নির্ঘূম রাত কাটায় সন্তানের ঘুমের জন্য। মা পরম আদর আর সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে সন্তানকে ঘিরে রাখে সর্বক্ষণ। সন্তান কোথাও গেলে আল্লাহর নিকট দুআ করে যেন তার সন্তান নিরাপদে ঘরে ফিরে আসে। সন্তানও যে কোন বিপদে ছুটে আসে মায়ের কোলে। পরম নির্ভরতায় ভরে থাকে তার বুক। যত বিপদই আসুক না কেন মা যদি বুকের সাথে চেপে ধরে কিংবা স্নেহ মাখা দৃষ্টিতে একবার তাকায় তাহলে সব কষ্ট যেন নিমিষেই উধাও হয়ে যায়। এই হল মা। আর পিতা? তাকে তো সন্তানের মুখে এক লোকমা আহার তুলে দেয়ার জন্য করতে হয় অক্লান্ত পরিশ্রম। মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হয়। সহ্য করতে হয় কতধরণের কষ্ট এবং ক্লেশ। সন্তানের জন্যই তো তাকে কখনো কখনো কৃপনতা করতে হয়। কখনো বা ভীরুতার পরিচয়দিতে হয়। সন্তান কাছে গেলে হাঁসি মুখে তাকে বুকে টেনে নেয়। তার নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য সে যে কোন ধরণের বিপদের সম্মুখীন হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। ইত্যাদি কারণে আমাদের অস্তিত্বের প্রতিটি কোণা পিতা-মাতার নিকট ঋণী। আর তাই তো আলকুরআনে আল্লাহ তা’আলার ইবাদতের পরই পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করার কথা উচ্চারিত হয়েছে বার বার। ইরশাদ হচ্ছেঃ.وَقَضَى رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً إِمَّايَبْلُغَنَّ عِنْدَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلاهُمَا فَلا تَقُلْ لَهُمَا أُفٍّوَلا تَنْهَرْهُمَا وَقُلْ لَهُمَا قَوْلاً كَرِيماً“তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে; তাদের একজন অথবা উভয়ে উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলেও আদেরকে বিরক্তি সূচক কিছু বলো না। এবং তাদেরকে ভর্র্ৎসনা করো না; তাদের সাথে কথা বলো সম্মান সূচক নম্র কথা।”(সূরা বনী ইসরাঈলঃ ২৩).আল কুরআনের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষ্যকার, প্রখ্যাত সাহাবী অবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রাঃ) বলেনঃ আল কুরআনে এমন তিনটি আয়াত আছে যেখানে তিনটি জিনিস তিনটি জিনিসের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। একটি ছাড়া অন্যটি অগ্রহণযোগ্য।সে তিনটি আয়াত হলঃ১)আল্লাহ তাআলা বলেন,হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং আনুগত্য কর তার রাসূলের। এবং (তাদের বিরুদ্ধাচারণ করে) নিজেদের আমল বিনষ্ট কর না।(সূরা মুহাম্মাদ: ৩৩)কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্য করে কিন্তু রাসূলের আনুগত্য না করে তাহলে তা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।.২)আল্লাহ তায়ালা বলেন,এবং তোমরা সালাত (নামায) আদায় কর এবং যাকাত দাও।(সূরা বাক্বারাঃ ৪৩)কেউ যদি নামায পড়ে কিন্তু যাকাত দিতে রাজী নয় তাহলে তাও আল্লাহর দরবারে গ্রহণীয় নয়।.৩)আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ “আমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় কর।”(সূরা লোকমানঃ ১৪)কেউ যদি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করে কিন্তু পিতা-মাতার কৃতজ্ঞতা আদায় না করে তবে তা আল্লাহর নিকট প্রত্যাখ্যাত।.সে কারণেই মহাগ্রন্থ আল কুরআনে একাধিকবার আল্লাহর আনুগত্যের নির্দেশের সাথে সাথে পিতা-মাতার আনুগত্য করার প্রতি নির্দেশ এসেছে। ধ্বনীত হয়েছে তাদের সাথে খারাপ আচরণ করার প্রতি কঠিন হুশিয়ারী। তা যে কোন কারণেই হোক না কেন। ইরশাদ হচ্ছেঃوَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئاً وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَاناً“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। এবং তার সাথে কাউকে শরীক কর না আর পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর।”(সূরা নিসাঃ ৩৬).আল্লাহ তাআলা আরো ইরশাদ করেনঃوَوَصَّيْنَا الْأِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْناً“আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে।”(সূরা আনকাবূতঃ ৮).তিনি আরও বলেনঃوَوَصَّيْنَا الْأِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْناً عَلَى وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ“আর আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে (সন্তানকে) কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে এবং তার দুধ ছাড়ানো হয় দুই বছরে। সুতরাং আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। প্রত্যাবর্তন তো আমারই নিকট।”(সূরা লোকমানঃ ১৪)উল্লেখিত আয়াতগুলোতে স্পষ্টভাবে পিতা-মাতার মর্যাদা এবং তাদের প্রতি সন্তানদের অধিকারের প্রমাণ বহন করছে।.প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস থেকেঃ নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীস থেকেও এ ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়ঃ১) পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টিঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ“পিতা-মাতার সন্তুষ্টির উপরই আল্লাহর সন্তুষ্টি আর পিতা-মাতার অসন্তষ্টির উপরই আল্লাহর সন্তুষ্টি নির্ভর করছে।” (ত্ববারানী কাবীর-সহীহ). ২) ফিরে যাও, তাদের মুখে হাঁসি ফোটাওঃ আবদুল্লাহ ইবন আমর ইবন আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, জনৈক সাহাবী নবী করীম (সাল্লালাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে বললেন, আমি আপনার কাছে এসেছি হিজরত করার জন্য শপথ করতে। আমি যখন আসি আমার পিতা-মাতা কাঁদছিলেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,“তাদের কাছে ফিরে যাও, এবং যেমন তাদেরকে কাঁদিয়েছিলে এখন তাদেরকে গিয়ে হাঁসাও।” (আবু দাউদ, নাসাঈ,ইবন মাজাহ-সহীহ).৩) তার পা ধর, ওখানেই তোমার জান্নাতঃ মুয়া’বিয়া ইবন জাহাম সুহামী নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে বললেন,“যাও, তোমার আম্মার সেবা কর।” কিন্তু তিনি জিহাদে যাওয়ার জন্য বার বার অনুরোধ জানাতে থাকলে তিনি বললেন, “হায় আফসোস!তোমার মার পা ধরে থাক। ওখানেই তোমার জান্নাত।” (মুসনাদ আহমাদও ইবন মাজাহ্).৪) পিতার তুলনায় মার অধিকার তিনগুণ বেশীঃ সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবী আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত,একলোক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমার উত্তম সংস্রব পাওয়ার জন্য কে সবচেয়ে বেশী উপযুক্ত? তিনি বললেন, তোমার মা।” লোকটি আবার প্রশ্ন করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে আবার প্রশ্ন করল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে আবার প্রশ্ন করল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার পিতা।” (বুখারী-মুসলিম)অত্র হাদীস প্রমাণ বহন করে, পিতার তুলনায় মা তিনগুণ সদাচারণ পাওয়ার অধিকারী। কারণ, গর্ভে ধারণ, ভুমিষ্ট ও দুগ্ধদানের ক্ষেত্রে কেবল মাকেই অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করতে হয়। পিতা কেবল সন্তান প্রতিপালনে স্ত্রীর সাথে অংশ গ্রহণ করে। এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ ত।আলা ইরশাদ করেনঃ.وَوَصَّيْنَا الْأِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَاناً حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهاً وَوَضَعَتْهُ كُرْهاً وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلاثُونَ شَهْرا “আমি তো মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণের নির্দেশ দিয়েছি। তার জননী তাকে (সন্তানকে) গর্ভে ধারণ করেছে কষ্টেরসাথে এবং প্রসব করেছে কষ্টের সাথে। তাকে গর্ভে ধারতে ও তার স্তন ছাড়াতে সময় লাগে ত্রিশ মাস।”(আহক্বাফঃ ১৫).৫) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানের প্রতি আল্লাহ তা’আলা কিয়ামতের দিন তাকাবেন নাঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেনঃতিন শ্রেণীর লোকের প্রতি আল্লাহ তা’আলা তাকাবেন না। তাদের মধ্যে একজন হল, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। (সহীহ-নাসঈ, আহমাদ, হাকেম).৬) পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান জান্নাতে প্রবেশ করবে নাঃ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেনঃতিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তাদের মধ্যে একজন হল, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান। (সহীহ-নাসঈ, আহমাদ, হাকেম). ৭) তবুও অবাধ্যতা নয়ঃ মু’য়ায (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে দশটি বিষয়ে উপদেশ দিয়ে গেছেন। তা হলো, আল্লাহর সাথে শিরক করবেনা যদিও তোমাকে কেটে টুকরো টুকরো করে দেয়া হয় এবং আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া হয়। এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হবে না যদিও তারা তোমাকে তোমার পরিবার, এবং সম্পদ ছেড়ে চলে যেতে বলে…(মুসনাদ আহমাদ)নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর মাঃপিতা-মাতার সাথে কিরূপ আচরণ করতে হবে সে ব্যাপারে ইতি পূর্বে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর একাধিক হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। এখন দেখব নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মা-জননীর প্রতি বাস্তব জীবনে আমাদের জন্য কী আদর্শ রেখে গেছেন।সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে, হুদায়বিয়া সন্ধির সময় প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীদের সাথে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সাথে আছে এক হাযার ঘোড় সাওয়ার। মক্কা ও মদীনার মাঝে আবওয়া নামক স্থানে তাঁর প্রাণ প্রিয় মা-জননী চির নিদ্রায় শায়িত আছেন। সে পথ দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি যাত্রা বিরতী করে তাঁর মা’র কবর যিয়ারত করতে গেলেন। কবরের কাছে গিয়ে তিনিকাঁন্নায় ভেঙ্গেপড়লেন। তার চর্তুদিকে দাঁড়িয়ে থাকা সাহাবীগণও কাঁদতে লাগলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমি আল্লাহর দরবারে আমার মা’র জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়েছিলাম কিন্তু অনুমতি দেয়া হয়নি। কিন্তু তার কবর যিয়ারতের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করলে তিনি তাতে অনুমতি দেন। সুতরাং তোমরা কবর যিয়ারত কর। কারণ, কবর যিয়ারত করলে পরকালের কথা স্মরণ হয়।”(সহীহ মুসলিম).ইবরাহীম (আঃ) এবং তার পিতা-মাতাঃইবরাহীম (আঃ) এর পিতা-মাতা কাফের ছিল। তারপরও তিনি তাদের সাথে অত্যন্ত- বিনয় ও ভদ্রতা সুলোভ আচরণ করতেন। তিনি তার পিতাকে শিরক পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেনঃ.يَا أَبَتِ لِمَ تَعْبُدُ مَا لا يَسْمَعُ وَلا يُبْصِرُ وَلا يُغْنِي عَنْكَ شَيْئاًআব্বাজান, আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদত করছেন যা শুনে না, দেখে না এবং আপনার কোন উপকারও করতে পারে না? কিন্তু সে তা শুধু প্রত্যাখ্যানই করল না বরং তাকে মেরে-পিটে তাড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিল। তখন তিনি শুধু এতটুকুই বলেছিলেনঃقَالَ سَلامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيّاً“আপনাকে সালাম। আমি আপনার জন্য আল্লাহর জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব।”(সূরা মারইয়ামঃ ৪৭)ইয়াহয়া (আঃ): .আল্লাহ তা’আলা তার প্রশংসা করে বলেনঃ সে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচারী ছিল।”(সূরা মারইয়ামঃ ১৪)এভাবে অনেক নবীর কথা আল কুরআনে উল্লেখ করে আল্লাহ তা’আলা বিশ্ববাসীর সামনে অনুকরণীয আমাদের পূর্ব পুরুষগণ পিতা-মাতার সাথে সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। এসমস্ত মহামনিষীদের মধ্যে আবু হুরাইরা (রাঃ), আবদুল্লাহ্ ইবন্ মাসঊদ (রাঃ), ইবন্ হাসান তামীমী (রহঃ), ইবন আউন মুযানী (রহঃ) প্রমুখের নাম ইতিহাসখ্যাত।পিতা-মাতার অবাধ্যতার বিভিন্ন রূপঃপিতা-মাতার অবাধ্যতার বিভিন্ন রূপ হতে পারে যা হয়ত অনেক মানুষের কাছেই অজানা।১) পিতা-মাতার উপর নিজেকে বড় মনে করা। অর্থ-সম্পদ, শিক্ষা-দীক্ষা, সম্মান-প্রতিপত্তিতে পিতা-মাতার চেয়ে বেশী অথবা অন্য যে কোন কারণেই হোক না কেন নিজেকে বড় বড় মনে করা।২) পিতা-মাতাকে পিতা-মাতাকে সহায়-সম্বলহীন এবং নিঃস্ব অবস্থায় ফেলে রাখা এবং যার কারণে তারা মানুষের দ্বারে দ্বারেহাত পাততে বাধ্য হয়।৩) বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী-পুত্র বা অন্য কাউকে, এমনকি নিজের প্রয়োজনকেও পিতা-মাতার উপর অগ্রাধিকার দেয়া তাদের নাফরমানীর অন্তর্ভূক্ত।৪) পিতা-মাতাকে শুধু নাম ধরে বা এমন শব্দ প্রয়োগে ডাকা যা তাদের অসম্মান ও মর্যাদাহানীর ইঙ্গিত দেয়।৫) পিতা-মাতার সাথে চোখ রাঙ্গিয়ে ধমকের সুরে কথা বলা।৬) তাদের সেবা-শুশ্রূষা না করা এবং শারিরীক বা মানষিক দিকের প্রতি লক্ষ না রাখা। বিশেষ করে বৃদ্ধ বয়সে বা রোগ-ব্যাধিতে তাদের প্রতি অবহেলা না কররা।
পরিশেষেঃপ্রতিটি জ্ঞানবান মানুষের কাছে আহ্বান জানাবো, আসুন, পিতা-মাতার ব্যাপারে অবহেলা করার ব্যাপারে সাবধান হই। তাদের প্রতিপ্রর্দশন করি সর্বোচ্চ সম্মান জনক আচরণ। কারণ এর মাধ্যমেই আমাদের পার্থিব জীবন সুন্দর হবে। গুনাহ-খাতা মাফ হবে। পরকালেমিলবে চির সুখের নিবাস জান্নাত।মহিমাময় আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাই হে পরওয়ারদেগার, আমাদেরকে আমাদের পিতা-মাতার সাথে চির শান্তির নীড় জান্নাতেএকত্রিত করিও। এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। আমীন !
সোমবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৫
বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি, ২০১৫
তাবীজ-কবজ, রিং, বালা, সুতা ইত্যাদী ব্যবহার
বর্তমানে অনেক মুসলমান রোগ-
ব্যাধি ও অন্যান্য
সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার
আশায় তাবীজ-কবজ, রিং, বালা,
সুতা ইত্যাদী ব্যবহার করে থাকে।
কুরআন ও সহীহ হাদীছের
আলোকে উপরোক্ত
জিনিষগুলো ব্যবহার করা সম্পূর্ণ
হারাম। নিন্মে রেফারেন্স সহ
এজাতীয় জিনিষগুলো ব্যবহার
করা হারাম হওয়ার দলীল সমূহ পেশ
করা হল:
1) নবী করীম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ( ﻣﻦ
ﻋﻠﻖ ﺷﻴﺌﺎ ﻭﻛﻞ ﺇﻟﻴﻪ ) “যে ব্যক্তি কোন
জিনিষ লটকাবে, তাকে ঐ জিনিষের
দিকেই সোপর্দ করে দেয়া হবে”।[১]
2) কোন এক
সফরে নবী সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন লোক
পাঠিয়ে বলে দিলেন যেঃ ﺃَﻥْ ﻻَ ﻳَﺒْﻘَﻴَﻦَّ
ﻓِﻲ ﺭَﻗَﺒَﺔِ ﺑَﻌِﻴﺮٍ ﻗِﻼَﺩَﺓٌ ﻣِﻦْ ﻭَﺗَﺮٍ ﺃَﻭْ ﻗِﻼَﺩَﺓٌ ﺇِﻻَّ ﻗُﻄِﻌَﺖْ
“কোন উটের গলায় ধনুকের
রশি বা গাছের ছাল দিয়ে তৈরী হার
ঝুলানো থাকলে অথবা যে কোন
মালা থাকলে সেটি যেন অবশ্যই
কেটে ফেলা হয়।”[2]
3) নবী করীম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ﺇِﻥَّ
ﺍﻟﺮُّﻗَﻰ ﻭَﺍﻟﺘَّﻤَﺎﺋِﻢَ ﻭَﺍﻟﺘِّﻮَﻟَﺔَ ﺷِﺮْﻙٌ ) “ঝাড়-ফুঁক করা,
তাবীজ
লটকানো এবংস্বামী বা স্ত্রীর
মাঝে ভালবাসা সৃষ্টির
জন্যে যাদুমন্ত্রের আশ্রয়
নেয়া শির্ক”।[3]
4) নবী করীম সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম অন্য এক
হাদীছে বলেনঃ ( ﻣَﻦْ ﺗَﻌَﻠَّﻖَ ﺗَﻤِﻴﻤَﺔً ﻓﻼ ﺃﺗﻢ ﺍﻟﻠﻪ
ﻟﻪ ﻭﻣﻦ ﻋﻠﻖ ﻭﺩﻋﺔ ﻓﻼ ﻭﺩﻉ ﺍﻟﻠﻪ ﻟﻪ )
“যে ব্যক্তি তাবীজ লটকালো,
আল্লাহ্ যেন তার উদ্দেশ্য পূর্ণ
না করেন। আর
যে ব্যক্তি রুগমক্তির
জন্যে শামুক বা ঝিনুকের
মালা লটকালো, আল্লাহ্ যেন
তাকে শিফা না দেন”।[৪]
5) তিনি অন্য এক হাদীছে বলেনঃ ( ﻣَﻦْ
ﺗَﻌَﻠَّﻖَ ﺗَﻤِﻴﻤَﺔً ﻓَﻘَﺪْ ﺃَﺷْﺮَﻙَ ) “যে ব্যক্তি তাবীজ
লটকালো সে শির্ক করল”।[৫]
6) নবী (সাঃ) এক ব্যক্তির
হাতে পিতলের
একটি আংটা দেখে বললেনঃ এটি কী?
সে বললঃ এটি দুর্বলতা দূর করার
জন্যে পরিধান করেছি।
তিনি বললেনঃ ( ﺍﻧْﺰِﻋْﻬَﺎ ﻓَﺈِﻧَّﻬَﺎ ﻟَﺎ ﺗَﺰِﻳﺪُﻙَ ﺇِﻟَّﺎ ﻭَﻫْﻨًﺎ
ﻓَﺈِﻧَّﻚَ ﻟَﻮْ ﻣِﺖَّ ﻭَﻫِﻲَ ﻋَﻠَﻴْﻚَ ﻣَﺎ ﺃَﻓْﻠَﺤْﺖَ
ﺃَﺑَﺪًﺍ )“তুমি এটি খুলে ফেল। কারণ
এটি তোমার
দুর্বলতা আরো বাড়িয়ে দিবে। আর
তুমি যদি এটি পরিহিত অবস্থায়
মৃত্যু বরণ কর, তাহলে তুমি কখনই
সফলতা অর্জন করতে পারবে না”।[৬]
7) হুজায়ফা (রাঃ) দেখলেন এক
ব্যক্তির
হাতে একটি সুতা বাঁধা আছে।
তিনি তা কেটে ফেললেন
এবং কুরআনের এই আয়াতটি পাঠ
করলেনঃ) ﻭَﻣَﺎ ﻳُﺆْﻣِﻦُ ﺃَﻛْﺜَﺮُﻫُﻢْ ﺑِﺎﻟﻠَّﻪِ ﺇﻻَّ ﻭَﻫُﻢْ ﻣُﺸْﺮِﻛُﻮﻥَ
(“তাদের অধিকাংশই
আল্লাহকে বিশ্বাস করে; কিন্তু
সাথে সাথে শিরকও করে”।
(সূরা ইউসুফঃ ১০৬) ৮) সাঈদ বিন
জুবায়ের (রাঃ)
বলেনঃ যে ব্যক্তি কোন মানুষের
শরীর থেকে একটি তাবীজ
কেটে ফেলল, সে একটি গোলাম আযাদ
করার ছাওয়াব পেল। সাঈদ বিন
জুবায়েরের এই কথাটি নবী (সাঃ)
হতে বর্ণিত মারফু হাদীছের
পর্যায়র্ভূক্ত।
——————————————————————————–
[১] -তিরমিযী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্
তিব্ব। শায়খ নাসির উদ্দীন
আলবানী (রঃ) হাসান বলেছেন।
( দখুনঃ সহীহুত্ তিরমিযী হা নং-
২০৭২ )
[২] – বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্
তিব্ব।
[৩] – আবু দাউদ, অধ্যায়ঃ কিতাবুত্
তিব্ব। শায়খ নাসির উদ্দীন
আলবানী হাদীছ সহীহ বলেছেন।
দেখুনঃ সিলসিলায়ে সহীহা হাদীছ
নং- (৬/১১৬১)। এখানে যে ঝাড়ফুঁক
করাকে শির্ক বলা হয়েছে,
তা দ্বারা শির্কী কালামের
মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক উদ্দেশ্য।
তবে ঝাড়ফুঁক যদি আল্লাহর কালাম,
আল্লাহর সিফাত বা সহীহ
হাদীছে বর্ণিত কোন বাক্যের
মাধ্যমে হয়, তাতে কোন
অসুবিধা নেই।
[৪] – হাকেম, (৪/২১৯। ইমাম
আলবানী (রঃ) হাদীছটিকে যঈফ
বলেছেন।
দেখুনঃ সিলসিলায়ে যঈফা, (৩/৪২৭)
[৫] – মুসনাদে আহমাদ, (৪/১৫৬) ইমাম
আলবানী সহীহ বলেছেন, দেখুন
সিলসিলায়ে সহীহা হাদীছ নং-
(১/৮০৯)
[৬] – মুসনাদে আহমাদ,
দেখুনঃ আহমাদ শাকেরের তাহকীক,
(১৭/৪৩৫) তিনি হাদীসটিকে সহীহ
বলেছেন।
বিদাত কি?
বিদ‘আত কাকে বলে এ বিষয়ে অনেকেরই স্পষ্ট
ধারণা নেই। অনেকের ধারণা যা আল্লাহর
রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের
যুগে ছিলনা তা-ই বিদ‘আত। আবার
অনেকে মনে করেন বর্তমান নিয়মতান্ত্রিক
মাদ্রাসা শিক্ষা পদ্ধতি একটি বিদ‘আত,
মসজিদে কাতার করে নাম ায
পড়া বিদাত, বিমানে হজ
্জে যাওয়া বিদ‘আত, মাইকে আজান
দেয়া বিদ‘আত ইত্যাদি। এ সকল দিক
বিবেচনা করে তারা বিদ‘আতকে নিজেদের খেয়াল
খুশি মত দুই ভাগ করে কোনটাকে হাসানাহ (ভাল
বিদ‘আত) আবার কোনটাকে সাইয়্যেআহ (মন্দ
বিদ‘আত) বলে চালিয়ে দেন। আসলে বিদ‘আত
সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে এ
বিভ্রান্তি।
বিদ‘আতের আভিধানিক অর্থ হল:
ﻭﻣﻨ ﻗﻮﻟﻪ ﺗﻌﺎﻟﻰ (ﻗﻞ ﻣﺎ ﻛﻨﺖ ﺑﺪﻋﺎ ﻣﻦ ﺍﻟﺮﺳﻞ ) ﻭﺟﺎﺀ ﻋﻠﻰ ﻫﺬﺍ ﺍﻟﻤﻌﻨﻰ ﻗﻮﻝ ﻋﻤﺮ ﺭﺿﻲﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻪ ( ﻧﻌﻤﺖ ﺍﻟﺒﺪﻋﺔ
অর্থ: পূর্বের দৃষ্টান্ত ব্যতীত নতুন সৃষ্ট কোন বিষয়
বা বস্তু। যেমন আল্লাহ
তা‘আলা বলেন: “বলুন,আমি তো কোন নতুন রাসূল
নই”। আসলে মুহাম্মাদ
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাসূল
হিসাবে নতুনই। কিন্তু এ আয়াতে বিদ‘আত শব্দের
অর্থ হল এমন নতুন যার দৃষ্টান্ত ইতোপূর্বে গত
হয়নি। আর উমার (রাঃ) তারাবীহর জামাত
কায়েম করে বলেছিলেন “এটা উত্তম
বিদ‘আত।” এখানেও বিদ‘আতের আভিধানিক অর্থ
প্রযোজ্য।
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়
বিদ‘আতের সংজ্ঞা
ﻣﺎ ﺃﺣﺪﺙ ﻓﻲ ﺩﻳﻦ ﺍﻟﻠﻪ ﻭﻟﻴﺲ ﻟﻪ ﺃﺻﻞ ﻋﺎﻡ ﻭﻻ ﺧﺎﺹ ﻳﺪﻝ ﻋﻠﻴﻪ .
‘যা কিছু আল্লাহর দ্বীনে নতুন সৃষ্টি করা হয়
অথচ এর সমর্থনে কোন ব্যাপক বা বিশেষ দলীল
প্রমাণ নেই।’
অর্থাত নব সৃষ্ট বিষয়টি অবশ্যই দ্বীনের
ব্যপারে বা ধর্মীয় ব্যাপারে বা আল্লাহর
নৈকট্য লাভের ব্যাপারে হতে হবে।
যদি ধর্মীয় ব্যাপার ব্যতীত অন্য কোন বিষয়ে নব-
আবিস্কৃত কিছু দেখা যায় তা শরীয়তের
পরিভাষায় বিদ‘আত বলে গণ্য হবে না,যদিও
শাব্দিক অর্থে তা বিদ‘আত।
এ প্রসঙ্গে আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ)
তার ‘র্শিক ও বিদ‘আত’ কিতাবে বিদ‘আতের
পরিচ্ছন্ন সংজ্ঞা উল্লেখ করেছেন। তা হল:
যে বিশ্বাস বা কাজ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করেননি কিংবা পালন করার
নির্দেশ দেননি সেই ধরনের বিশ্বাস
বা কাজকে দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত করা,এর অঙ্গ
বলে সাব্যস্ত করা, সওয়াব বা আল্লাহর নৈকট্য
লাভের উপায় মনে করা, এই ধরনের কাজ করার
নাম বিদ‘আত।
যে সকল বিশ্বাস ও কাজকে দ্বীনের অংশ মনে করে
অথবা সওয়াব হবে ধারণা করে ‘আমল করা হয়
তা বিদ‘আত। কারণ হাদীস
ে এসেছে : আয়িশা (রাঃ)
থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে কারীম
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেন:
“যে আমাদের এ ধর্মে এমন কোন নতুন বিষয় উদ্ভাবন
করবে যা ধর্মে অন্তর্ভুক্ত ছিল
না তা প্রত্যাখ্যাত হবে”। (বুখারী ও মুসলিম)
এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট হল যে,নতুন আবিস্কৃত
বিষয়টি যদি ধর্মের অন্তর্ভুক্ত বা আল্লাহর নৈকট্য
লাভের উপায়
বলে ধরে নেয়া হয় তাহলে তা বিদ‘আত ও
প্রত্যাখ্যাত।
হাদীসে আরো এসেছে:
“যে ব্যক্তি এমন কাজ করল যার প্রতি আমাদের
(ইসলামের) নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যাত”।
(মুসলিম)
এ হাদীসে “যার প্রতি আমাদের নির্দেশ
নেই” বাক্যটি দ্বারা এ
কথা বুঝানো হয়েছে যে, বিষয়টি ধর্মীয় হতে হবে।
ধর্মীয় বিষয় হিসাবে কোন নতুন ‘আমল করলেই
বিদ‘আত হবে।
যারা মাইকে আজান দেন তারা জানেন যে,
আযান দেয়া সওয়াবের/ইবাদতের/
আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। কিন্তু,
আজানে মাইক ব্যাবহারে আলাদা কোন
মর্যাদা নেই বা আজানে মাইক ব্যবহার
করা সওয়াবের কাজ বলে তারা মনে করেন না।
এমনিভাবে বিমানে হজ্জে যাওয়া,
প্রাতিষ্ঠানিক মাদ্রাসার প্রচলন,
নাহু সরফের শিক্ষা গ্রহণ প্রভৃতি বিষয় ধর্মীয়
বিষয়/সওয়াবের/ইবাদতের/আল্লাহর নৈকট্য
লাভের উপায় বলে মনে করা হয় না,
তাই তা বিদ‘আত হওয়ার প্রশ্ন আসে না। এ
ধরনের বিষয়গুলি বিদ‘আত নয়
বরং সুন্নাতে হাসানাহ বলা যেতে পারে।
অনেকে এ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য
বিদ‘আতকে দু’ভাগে ভাগ করার চেষ্টা করেন।
বিদ‘আতে হাসানাহ ও বিদ‘আতে সাইয়্যেআহ।
সত্যি কথা হল বিদ‘আতকে এভাবে ভাগ
করাটা হল আরেকটি বিদ‘আত
এবং তা হাদীসে রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের
পরিপন্থী।
কেননা রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
“সকল নব-আবিস্কৃত (দীনের মধ্যে) বিষয়
হতে সাবধান! কেননা প্রত্যেকটি নব-আবিস্কৃত
বিষয় বিদ‘আত,আর প্রত্যেকটি বিদ‘আত হল
পথভ্রষ্টতা”। (আবূ
দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী)
রাসূলে কারীম
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
সকল প্রকার বিদ‘আত ভ্রষ্টতা। এখন যদি বলা হয়
কোন কোন বিদ‘আত আছে যা হাসানাহ
বা উত্তম, তাহলে ব্যাপারটি সম্পূর্ণ
হাদীসবিরোধী হয়ে যায়। তাই তো ইমাম মালিক
(রঃ) বলেছেন :”যে ব্যক্তি ইসলামের মধ্যে কোন
বিদ‘আতের প্রচলন করে আর ইহাকে হাসানাহ
বা ভাল বলে মনে করে, সে যেন প্রকারান্তরে এ
বিশ্বাস পোষণ করে যে মুহাম্মাদ
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
আল্লাহর পয়গাম পৌছাতে খিয়ানাত করেছেন।
কারণ আল্লাহ তা‘আলা নিজেই বলেন: ‘আজ
আমি তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্মকে পূর্ণ
করে দিলাম।’ সুতরাং রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের
যুগে যা ধর্ম রূপে গণ্য ছিল না আজও তা ধর্ম
বলে গণ্য হতে পারে না।
তাই বিদ‘আতে হাসানাহ বলে কোন কিছু নেই।
আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
যা বলেছেন আমরা তাই বলব; সকল প্রকার
বিদ‘আত গোমরাহী ও ভ্রষ্টতা।
বিদ‘আতে হাসানায় বিশ্বাসীরা যা কিছু
বিদ‘আতে হাসানাহ হিসাবে দেখাতে চান
সেগুলো হয়ত শাব্দিক
অর্থে বিদ‘আত, শরয়ী অর্থে নয়
অথবা সেগুলো সুন্নাতে হাসানাহ।
যে সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
বলেছেন:
ﻭﻣﻦ ﺳﻦ ﻓﻲ ﺍﻹﺳﻼﻡﺳﻨﺔ ﺳﻴﺌﺔ ﻓﻠﻪ ﻭﺯﺭﻫﺎ ﻭﻭﺯﺭ ﻣﻦ ﻋﻤﻞ ﺑﻬﺎ ﻣﻦ ﺑﻌﺪﻩ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺃﻥ ﻳﻨﻘﺺ ﻣﻦ ﺃﻭﺯﺍﺭﻫﻢ ﺷﻲﺀ .
(ﺭﻭﺍﻩ ﻣﺴﻠﻢ ﻋﻦ ﺟﺮﻳﺮ ﺑﻦ ﻋﺒﺪ ﺍﻟﻠﻪﺭﺿﻲ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻨﻬﻤﺎ )
অর্থ: “যে ইসলামে কোন ভাল পদ্ধতি প্রচলন করল
সে উহার সওয়াব পাবে এবং সেই
পদ্ধতি অনুযায়ী যারা কাজ করবে তাদের
সওয়াবও সে পাবে, তাতে তাদের সওয়াবে কোন
কমতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন
খারাপ পদ্ধতি প্রবর্তন করবে সে উহার পাপ বহন
করবে, এবং যারা সেই পদ্ধতি অনুসরণ
করবে তাদের পাপও সে বহন করবে, তাতে তাদের
পাপের কোন কমতি হবে না”। (মুসলিম)
এখানে একটা প্রশ্ন হতে পারে যে, শবে বরাত
উদযাপন, মীলাদ
মাহফিল, মীলাদুন্নবী প্রভৃতি আচার-
অনুষ্ঠানকে কি সুন্নাতে হাসানাহ হিসাবে গণ্য
করা যায় না? মাইকে আজান
দেয়া, মাদ্রাসার
পদ্ধতি প্রচলন, আরবী ব্যাকরণ
শিক্ষা ইত্যাদি কাজগুলো যদি সুন্নাতে হাসানাহ
হিসাবে ধরা হয় তাহলে শবে বরাত, মীলাদ
ইত্যাদিকে কেন সুন্নতে হাসানাহ হিসাবে গ্রহণ
করা যাবে না?
পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, বিদ‘আত
হবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে।
যদি নতুন কাজটি ধর্মের অংশ
মনে করে অথবা সওয়াব লাভের
আশায় করা হয়, তাহলে তা বিদ‘আত হওয়ার
প্রশ্ন আসে।
আর যদি কাজটি ধর্মীয় হিসাবে নয়
বরং একটা পদ্ধতি হিসাবে করা হয়
তাহলে তা বিদ‘আত হওয়ার প্রশ্ন আসে না। যেমন
ধরুন মাইকে আজান দেয়া। কেহ
মনে করেনা যে, মাইকে আজান দিলে সওয়াব
বেশী হয় অথবা মাইক ছাড়া আজান
দিলে সওয়াব হবে না। তাই সালাত ও আজানের
ক্ষেত্রে মাইক ব্যবহারকে বিদ‘আত বলা যায় না।
তাই বলতে হয় বিদ‘আত ও সুন্নাতে হাসানার
মধ্যে পার্থক্য এখানেই যে,
কোন কোন নতুন কাজ ধর্মীয় ও সওয়াব লাভের
নিয়াত হিসাবে করা হয় আবার কোন কোন নতুন
কাজ দ্বীনি কাজ ও সওয়াবের নিয়াতে করা হয়
না বরং সংশ্লিষ্ট কাজটি সহজে সম্পাদন করার
জন্য একটা নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়।
যেমন আমরা যদি ইতিপূর্বে উল্লিখিত হাদীসটির
প্রেক্ষাপটের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই
যে, একবার মুদার গোত্রের কতিপয় অনাহারী ও
অভাবগ্রস্থ লোক আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের
কাছে এলো। তিনি সালাত আদায়ের পর তাদের
জন্য উপস্থিত লোকজনের কাছে সাহায্য চাইলেন।
সকলে এতে ব্যাপকভাবে সাড়া দিলেন।
রাসূলে কারীম
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম
সাহাবায়ে কিরামের আগ্রহ ও খাদ্য
সামগ্রী দান করার পদ্ধতি দেখে উল্লিখিত
কথাগুলি বললেন। অর্থাৎ,
“যে ইসলামে কোন ভাল পদ্ধতি প্রচলন করল
সে উহার সওয়াব পাবে এবং সেই
পদ্ধতি অনুযায়ী যারা কাজ করবে তাদের
সওয়াবও সে পাবে, তাতে তাদের সওয়াবে কোন
কমতি হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন
খারাপ পদ্ধতি প্রবর্তন করবে সে উহার পাপ বহন
করবে, এবং যারা সেই পদ্ধতি অনুসরণ
করবে তাদের পাপও সে বহন করবে, তাতে তাদের
পাপের কোন কমতি হবে না”। (মুসলিম)
অভাবগ্রস্তদের সাহায্যের
জন্য যে পদ্ধতি হাদীসে বর্ণিত
হয়েছে ওটাকে সুন্নাতে হাসানাহ বলা হয়েছে।
বলা যেতে পারে, সকল পদ্ধতি যদি হাসানাহ হয়
তাহলে সুন্নাতে সাইয়্যেআহ বলতে কি বুঝাবে?
উত্তরে বলব, মনে করুন কোন দেশের শাসক বা জনগণ
প্রচলন করে দিল যে এখন থেকে স্থানীয় ভাষায়
আজান দেয়া হবে, আরবী ভাষায়
দেয়া চলবে না। এ অনুযায়ী ‘আমল করা শুরু হল।
এটাকে আপনি কি বলবেন? বিদ‘আত বলতে পারবেন
না, কারণ যারা এ কাজটা করল
তারা সকলে জানে অনারবী ভাষায় আজান
দেয়া ধর্মের নির্দেশ নয় এবং এতে সওয়াবও নেই।
তাই আপনি এ কাজটাকে সুন্নাতে সাইয়্যেআহ
হিসাবে অভিহিত করবেন। এর প্রচলনকারী পাপের
শাস্তি প্রাপ্ত হবে, আর যারা ‘আমল
করবে তারাও।
আবার অনেক উলামায়ে কিরাম
বিদ‘আতকে অন্যভাবে দু ভাগে ভাগ করে থাকেন।
তারা বলেন বিদ‘আত দু প্রকার।
একটা হল বিদ‘আত ফিদ্দীন ( ﺍﻟﺒﺪﻋﺔﻓﻴﺎﻟﺪﻳﻦ)
বা ধর্মের ভিতর বিদ‘আত।
অন্যটা হল বিদ‘আত লিদ্দীন ( ﺍﻟﺒﺪﻋﺔﻟﻠﺪﻳﻦ) অর্থাৎ
ধর্মের জন্য বিদ‘আত।
প্রথমটি প্রত্যাখ্যাত আর অন্যটি গ্রহণযোগ্য।
আমার মতে এ ধরণের ভাগ নি
ষ্প্রয়োজন, বরং বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে সহায়ক।
কারণ প্রথমতঃ আল্লাহর রাসূল
সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন
সকল বিদ‘আত পথভ্রষ্টতা বা গোমরাহী।
এতে উভয় প্রকার বিদ‘আত শামিল।
দ্বিতীয়তঃ অনেকে বিদ‘আত ফিদ্দীন
করে বলবেন, আমি যা করেছি তা হল বিদ‘আত
লিদ্দীন। যেমন কেহ মীলাদ পড়লেন। অতঃপর
যারা এর প্রতিবাদ করলেন তাদের
সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ে অনেক দূর
যেয়ে বললেন, মীলাদ পড়া হল বিদ‘আত লিদ্দীন –
এর দ্বারা মানুষকে ইসলামের পথে ডাকা যায়।
অথচ তা ছিল বিদ’আতে ফিদ্দীন
(যা প্রত্যাখ্যাত) !
আসলে যা বিদ‘আত লিদ্দীন বা দ্বীনের
স্বার্থে বিদ‘আত তা শরীয়তের পরিভাষায়
বিদ‘আতের মধ্যে গণ্য করা যায় না।
সেগুলোকে সুন্নাতে হাসানাহ হিসাবে গণ্য
করাটাই হাদীসে রাসূল দ্বারা সমর্থিত।
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! বিদ‘আত সম্পর্কে এ
কথাগুলো এখানে এ জন্য আলোচনা করলাম
যাতে আলোচ্য বিষয়ের উপর কোন প্রশ্ন
বা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে তার সমাধান যেন
পাঠকবৃন্দ সহজে অনুধাবন করতে পারেন।